আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে পড়াশোনা শেষ করে কিংবা প্রবাস জীবন ছেড়ে অনেকেই যখন তথাকথিত চাকরির পেছনে ছোটে, ঠিক সেই সময়ে একটু ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম। নিজের মেধা, শ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে গড়ে তুলেছেন ‘হাজেরা এগ্রো ফার্ম’ নামের একটি আধুনিক গবাদি পশুর খামার। লাভজনক এই খামারটি আজ কেবল খোরশেদ আলমের নিজের ভাগ্যই বদলায়নি, বরং এলাকার বেকার যুবকদের মধ্যেও আশার আলো জাগাচ্ছে।

খামারে পা রাখলেই চোখে পড়ে সারি সারি উন্নত জাতের গরু। এখানে থাকা সব গরুই মূলত উচ্চ উৎপাদনশীল ফ্রিজিয়ান জাতের। সব মিলিয়ে খামারে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৩৩টি গবাদি পশু রয়েছে। এর মধ্যে দুধের জোগান দিতে নিয়মিত প্রস্তুত রয়েছে ১২টি গাভী। এই গাভীগুলো থেকে প্রতিদিন সকাল-বিকাল নিয়ম করে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৬০ লিটার তাজা দুধ। এই দুধ বিক্রির জন্য খুব বেশি দূরে যেতে হয় না খোরশেদ আলমকে; এলাকার স্বনামধন্য মিষ্টির প্রতিষ্ঠান ‘ফুলকলি’-র স্থানীয় আউটলেটেই নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে এই খাঁটি দুধ। এছাড়া খামারে বর্তমানে ৯টি ফুটফুটে ছোট বাছুর আর মাংসের বাজারের জন্য ১টি বড় আকারের মোটা-তাজাকরণ গরু রয়েছে। কিছুদিন আগেই খামার থেকে ভালো দামে ৮টি গরু বিক্রি করেছেন তিনি, যা তার ব্যবসাকে আরও চাঙা করে তুলেছে।
আমাদের দেশের খামার ব্যবসার মূল চাবিকাঠি হলো পশুর সঠিক খাদ্য ও পরিচর্যা। এ ক্ষেত্রে খোরশেদ আলম একটুও আপস করেন না। বিদেশি দামি খাবারের ওপর নির্ভর না করে তিনি নিজ হাতে পশুর পুষ্টিকর খাবার তৈরি করেন। খাবারের তালিকায় প্রতিদিন তিনি পুষ্টিকর কাঁচা ঘাস, নানা পদের ভুসি, প্রোটিনের জোগান দিতে সয়াবিন ও খৈল এবং শক্তির জন্য ভাঙানো ভুট্টা খাইয়ে থাকেন। আর এই বিশাল খামার একা সামলানো তো মুখের কথা নয়! খামারের চাকা সচল রাখতে নিয়মিত দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ০৩ জন দক্ষ শ্রমিক। তাদের নিখুঁত পরিচর্যাতেই গরুগুলো সুস্থ ও হাসিখুশি থাকে।
আমাদের দেশের খামারিদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো গরুর বড় কোনো রোগ দেখা দেওয়া। এর আগে এই খামারেও গবাদি পশুর পরিচিত ভয়ের কারণ এফএমডি এবং লাম্পি স্কিন ডিজিজ হানা দিয়েছিল। তবে ঘাবড়ে না গিয়ে খোরশেদ আলম সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা নেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিসের চিকিৎসকদের সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। যেকোনো সমস্যা হলেই সরকারি চিকিৎসকদের পরামর্শ ও সেবায় খামারটি বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পায়।
ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য অফিস থেকে এই খামারে বিনামূল্যে গবাদি পশু লালন-পালন ও আধুনিক পরিচর্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যবহুল মুদ্রণ সামগ্রী বা গাইডলাইন পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যা তাদের কাজের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী দিনে খামারটিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে খোরশেদ আলমের। দেশের আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বেকারত্ব দূর করার এই নিরলস প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। ‘হাজেরা এগ্রো ফার্ম’-এর এই সফল যাত্রা দেখে দেশের তরুণরা নিশ্চয়ই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার নতুন প্রেরণা পাবে।
প্রতিবেদক, খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা।
3
previous post
