কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলি ইউনিয়নের এক শান্ত-নিবিড় গ্রাম বাঁশমঙ্গল। এই গ্রামেরই একজন সংগ্রামী মানুষ মো. ফিরোজ মিয়া। পেশায় তিনি একজন সিএনজি চালক হলেও, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তিনি একজন সফল ব্রয়লার মুরগির খামারি। এই পথচলা শুরু করেছিলেন প্রায় ১২ বছর আগে, সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায়, নানা বাধা বিপত্তি পেরিয়ে।
সিএনজি চালিয়ে যা উপার্জন হতো, তা দিয়ে সংসার চললেও ফিরোজ মিয়ার মনে ছিল বড় কিছু করার ইচ্ছে। তিনি চেয়েছিলেন এমন কিছু করতে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে আয় নিশ্চিত হয়, পরিবারে সচ্ছলতা আসে। তখনই তাঁর চোখে পড়ে ব্রয়লার মুরগির খামার। তিনি খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারেন যে এই ব্যবসা যতটা কষ্টসাধ্য, ততটাই লাভজনকও যদি সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়।
প্রথম খামার শুরু করেন ১০০০টি ব্রয়লার বাচ্চা দিয়ে। স্থানীয় এক ডিলারের কাছ থেকে বাচ্চাগুলো সংগ্রহ করেন মাত্র ৩০ টাকা দরে। তখন অনেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন, কেউ বলেছিল মুরগি মরবে, কেউ বলেছিল লোকসান হবে। কিন্তু ফিরোজ মিয়া হার মানেননি। খামারে নিয়মিত ভ্যাকসিন, ভালো খাবার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ-সব কিছু বজায় রেখে প্রথম চালানেই তিনি মুনাফা অর্জন করেন।
তারপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিয়ম করে তিনি ৩০-৩৫ দিন বাচ্চাগুলো লালন পালন করেন, এবং স্থানীয় পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দেন। তাঁর খামারের ব্রয়লারগুলো স্বাস্থ্যবান ও সুস্থ থাকায় পাইকাররাও তাঁর খামারে আসতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। দিনে দিনে বাড়তে থাকে খ্যাতি ও আস্থা।
শুরুতে খামারের রোগ-বালাই ছিল ফিরোজ মিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি জানতেন না কোন রোগে মুরগি আক্রান্ত হচ্ছে, বা কখন চিকিৎসা দরকার। তখন স্থানীয় প্রাণি চিকিৎসকের সাহায্য নিতেন। কিন্তু তিনি শেখার আগ্রহ হারাননি। বিভিন্ন বই পড়া, ইউটিউব ভিডিও দেখা, অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে নিজেই মুরগির চিকিৎসা করা শিখে ফেলেন। এখন আর কোনো সমস্যা হলে তিনি নিজেই তা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেন।
তাঁর খামার পরিচালনায় আরও একটি ব্যতিক্রমী নিয়ম আছে-একটি শেড শেষ হওয়ার পর তিনি অন্তত ১৫ দিন বিরতি দেন নতুন শেড তোলার আগে। এই সময়ে তিনি শেডের মেঝে পুরোপুরি পরিষ্কার করেন, জীবাণুনাশক ছিটিয়ে জীবাণুমুক্ত করেন। এর ফলে পরবর্তী ব্যাচের মুরগিগুলো থাকে নিরাপদ ও রোগমুক্ত।
শীতকাল এবং গ্রীষ্মকালেও খামার পরিচর্যায় তিনি আলাদা কৌশল গ্রহণ করেন। শীতে ঠান্ডা বেশি থাকায় শেডে স্যাঁতসেঁতে ভাব তৈরি হয়, তাই প্রতিদিন শেডের মেঝে পরিষ্কার করেন। অন্যদিকে, গরম কালে অতিরিক্ত ধুলো ও দুর্গন্ধ দূর করতে একদিন পর পর পরিষ্কার করেন। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে মুরগিরা ভালোভাবে বেড়ে ওঠে, ফলে কম রোগে আক্রান্ত হয় এবং ভালো ওজন পায়।
খামার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, “শুরুতে অনেক কিছু বুঝতাম না। এখন আল্লাহর রহমতে সবই আয়ত্তে এসেছে। এই খামারই আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে।”
বর্তমানে তিনি একটি ছোট দল নিয়োগ দিয়েছেন যারা তাঁকে খামার পরিচালনায় সহযোগিতা করে। প্রতিটি কাজের জন্য তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকে-কে কখন খাবার দেবে, কে পরিষ্কার করবে, কে শেডে নজর রাখবে-সব কিছুই চলে পরিকল্পিতভাবে। ফলে কাজের মান যেমন ভালো হয়, তেমনি উৎপাদনও বাড়ে।
এই ব্রয়লার খামার থেকেই তিনি নিজের ছেলেমেয়ের পড়ালেখার খরচ চালান, সংসার চালান, এমনকি সঞ্চয়ও করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর এই সাফল্য দেখে এখন গ্রামের অনেক তরুণই আগ্রহী হচ্ছেন খামার গড়তে। ফিরোজ মিয়াও সবার মাঝে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে দেন নিঃসংকোচে। তিনি মনে করেন, “জ্ঞান যদি ভাগ করে না নিই, তাহলে সমাজে উন্নয়ন হবে না। আমি চাই সবাই যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।”
তাঁর ভবিষ্যত পরিকল্পনায় রয়েছে খামার আরও বড় করা, মুরগির পাশাপাশি ডিম উৎপাদনের একটি লেয়ার খামার চালু করা এবং নিজস্ব ব্র্যান্ডের মুরগি বাজারে আনা। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিশ্রম ও নিষ্ঠা থাকলে সাফল্য আসবেই।
সবশেষে,মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের মুদ্রণ সামগ্রী প্রদান করা হয় এসাথে দপ্তরের বিভিন্ন কাজ ও পরিচিতি দেয়া হয়।
