
একসময় ছিল নিরাপদ চাকরি, নির্দিষ্ট বেতন আর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে শিক্ষকতা, এরপর ব্যাংকের চাকরি। জীবনের আরাম-আয়েশের পথটা তার সামনে খোলাই ছিল। কিন্তু সেই নিরাপদ পথ ছেড়ে একদিন ফিরলেন গ্রামের মাটিতে। হাতে তুলে নিলেন কৃষির দায়িত্ব।
প্রত্যন্ত গ্রামের জমিতে শুরু করলেন মাছ, গরু, মুরগি ও জৈব সার উৎপাদনের সমন্বিত উদ্যোগ। উদ্দেশ্য শুধু নিজের কর্মসংস্থান নয়, কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক করে স্থানীয় তরুণদের জন্যও নতুন পথ তৈরি করা।
দুই বছর আগে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল নানা অনিশ্চয়তা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে, এখন সেখানে একসঙ্গে চলছে মাছ চাষ, ফাউমি মুরগি পালন, ষাঁড় গরু মোটাতাজাকরণ ও ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন।

চাকরি ছেড়ে কেন কৃষিতে?
নিরাপদ চাকরি ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামে কৃষি খামার করার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। দীর্ঘদিনের কর্মজীবন, প্রতিষ্ঠিত পেশা ও নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন পথে যাত্রা করতে হয়েছে তাকে। নিজের এলাকায় কিছু করার ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত তাকে কৃষির দিকে টেনে আনে। শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার পরিবর্তে এমন কিছু করতে চেয়েছেন, যার সঙ্গে নিজের গ্রাম, মানুষ ও মাটির সম্পর্ক রয়েছে।
শুরুতেই তিনি বুঝতে পারেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে আলাদা আলাদা খামার করার চেয়ে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থায় একাধিক খাতকে একই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনলে খরচ কমানো এবং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব। এই ধারণা বাস্তবে রূপ দিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছুটেছেন তিনি। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখেছেন, কথা বলেছেন কৃষক ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে। এরপর নিজের গ্রাম চরটেকীতে গড়ে তুলেছেন এমএম এগ্রো।
একই খামারে মাছ, মুরগি, গরু ও সার
সরেজমিনে চরটেকী গ্রামের এমএম এগ্রোতে গিয়ে দেখা যায়, প্রত্যন্ত গ্রামীণ পরিবেশের মধ্যেই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে খামারটি। খামারে রয়েছে চারটি আধুনিক ফিশারি। এসব পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। মাছের পাশাপাশি রয়েছে মুরগির খামার। বর্তমানে সেখানে প্রায় দুই হাজার ফাউমি মুরগি পালন করা হচ্ছে।
খামারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ষাঁড় গরু মোটাতাজাকরণ। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঘাস উৎপাদন করে গরুর খাদ্যের একটি অংশের চাহিদা পূরণের চেষ্টা চলছে। তবে এমএম এগ্রোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন।
বর্জ্যই যখন সম্পদ
সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার মূল শক্তি হলো একটি খাতের উপজাত অন্য খাতের কাজে লাগানো। এমএম এগ্রোতেও সেই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হচ্ছে। গবাদিপশুর গোবর ও অন্যান্য জৈব উপাদান ব্যবহার করে উৎপাদন করা হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট। যে বর্জ্য অন্য খামারে ব্যবস্থাপনার সমস্যা তৈরি করতে পারে, এখানেই সেটি পরিণত হচ্ছে মূল্যবান জৈব সারে।

বর্তমানে খামারটিকে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ টন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের সক্ষমতায় নেওয়া হচ্ছে। পুরোপুরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারলে এটি খামারের অন্যতম আয়ের খাত হয়ে উঠবে বলে আশা উদ্যোক্তার।
খামারের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য
খামারের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য বদিউল আলম। ২০১৫ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত হন।
বদিউল আলম বলেন, ‘খামারের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আমি পালন করছি। কে কী কাজ করছেন, কোথায় কী করতে হবে, সবকিছুই দেখাশোনা করি। আমরা যে জৈব সার উৎপাদন করছি, কৃষকরা তা ব্যবহার করলে ভালো ও নিরাপদ ফসল উৎপাদন সম্ভব।’
কৃষির ভেতরেই কৃষির আরেক অর্থনীতি
সমন্বিত কৃষির বিশেষত্ব এখানেই। আলাদা আলাদা খাত হিসেবে দেখলে মাছ, মুরগি, গরু ও সার উৎপাদন চারটি ভিন্ন ব্যবসা। কিন্তু একই খামারে এগুলোকে যুক্ত করলে একটি খাতের উপজাত অন্য খাতের সম্পদে পরিণত হয়।
গরুর গোবর থেকে তৈরি হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট। নিজস্বভাবে ঘাস উৎপাদনের মাধ্যমে গরুর খাদ্যের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা চলছে। মাছ চাষের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থার অন্যান্য অংশও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এভাবে খামারের প্রতিটি অংশ একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি চক্র তৈরি করছে। এতে উৎপাদন খরচ ও অপচয় কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
খামারের পরিচর্যা কর্মী রবি বলেন, ‘এখানে গরু, মাছ, মুরগি ও ভার্মি কম্পোস্টসহ বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। স্থায়ী ও স্থানীয় মিলিয়ে প্রায় আটজন কাজ করি। ঘাস কাটা, গোবর সংগ্রহ, পশু-পাখির খাবার ও পানি দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজ করি। প্রয়োজন হলে বেতন থেকে আগাম টাকা নেওয়ার সুযোগও পাই।’
আরেক কর্মী রিপন বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে এখানে কাজ করছি। এই কাজের আয় দিয়ে চার সদস্যের পরিবার চালাতে পারছি। প্রকল্পটি আরও বড় হলে আমাদের মতো আরও অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।’
শিক্ষার্থীদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ
পাকুন্দিয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী নিলয় পড়াশোনার পাশাপাশি এই খামারে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। কলেজের সময়ের ফাঁকে এখানে কাজ করি। এতে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছি। আমার মতো আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী এখানে কাজ করে।’
এমএম এগ্রোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান। খামারটিতে এলাকার কয়েকজন বেকার যুবক কাজ করছেন। পাশাপাশি ছুটির দিনে শিক্ষার্থীরাও কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। কেউ মাছের পরিচর্যা করছেন, কেউ গরুর দেখভাল করছেন, কেউ মুরগির খামারে কাজ করছেন। আবার কেউ যুক্ত আছেন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের সঙ্গে। ফলে শুধু একজন উদ্যোক্তার কর্মসংস্থান হয়নি, স্থানীয় পর্যায়েও তৈরি হয়েছে কাজের সুযোগ।
পরিবারের সমর্থন কেমন ছিল ইখতেয়ারের?
ইখতেয়ারের বড় ভাই ইলিয়াস উদ্দিন চুন্নু বলেন, ‘আমার ছোট ভাই বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে শিক্ষকতা করেছেন, পরবর্তীতে ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব নিরাপদ পেশা ছেড়ে এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। পরিবারের সবাই তার এই উদ্যোগকে উৎসাহ ও সমর্থন জানিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘ইখতেয়ার বিশ্বাস করেন, প্রথমবার ব্যর্থ হলেই পিছিয়ে যেতে হয় না। ভার্মি কম্পোস্ট, সবজি, মাছ, গাছপালা ও সুপারি বাগানসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখনো লাভের মুখ দেখা যায়নি, কিন্তু তিনি পিছিয়ে যেতে চান না। তার লক্ষ্য প্রকল্পটি বড় করে এলাকার বেকার যুবক ও কর্মক্ষম নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।’
দুই বছর আগে পরামর্শ নিতে এসেছিলেন
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে-ই-আলম জানান, প্রায় দুই বছর আগে ইখতেয়ার তার কাছে পরামর্শ নিতে এসেছিলেন। তখন তাকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সমন্বিত কৃষি খামার সরেজমিনে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ইখতেয়ার সেই পরামর্শ অনুসরণ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামার ঘুরে দেখেন এবং অভিজ্ঞতা নিজের খামারে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন।
কৃষি কর্মকর্তা নূরে-ই-আলম বলেন, ‘সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একটি খাতের উৎপাদিত উপকরণ অন্য খাতের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এতে উৎপাদন খরচ ও অপচয় কমে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এমএম এগ্রোকে একটি সম্ভাবনাময় সমন্বিত কৃষি মডেল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।’

খরচ কমিয়ে টেকসই কৃষির স্বপ্ন
নিজের উদ্যোগের লক্ষ্য সম্পর্কে ইখতেয়ার উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈবভিত্তিক কৃষি গড়ে তোলা। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমানোর চেষ্টা করছি। বিশেষ করে মাছ ও গবাদিপশুর খাবারের খরচ কমাতে কাজ করছি। এজন্য ফিড মেশিন এনেছি এবং বিভিন্ন উপায়ে খাবার তৈরি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। নেপিয়ার ঘাসসহ বিভিন্ন ধরনের ঘাস চাষ করছি।’
