কুমিল্লা, ২৮.১০.২০২৫ খ্রি.
গরু পালন বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা। এই পেশার মাধ্যমে একদিন নিজের ও পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার স্বপ্ন দেখেছিলেন মো. জসিম উদ্দিন। কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার ধনেশ্বর গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই সংগ্রামী মানুষটি আজ তার দৃঢ় মনোবল ও পরিশ্রমের মাধ্যমে হয়ে উঠেছেন সফল উদ্যোক্তা।
মো. জসিম উদ্দিনের জন্ম হয়েছিল কৃষকের ঘরে। ছোটবেলা থেকেই তিনি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রাথমিক থেকে শুরু করে এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তার উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সম্ভব হয়নি। তবে তিনি থেমে যাননি। কৃষি কাজের পাশাপাশি গরু পালন শুরু করেন। প্রথমে পারিবারিক প্রয়োজনে শুরু হওয়া এই কাজটি ধীরে ধীরে তার স্বপ্নে পরিণত হয়।
তিনি তার তিন ছেলে সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি সংসার চালানোর জন্য গরু খামারকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ ছিল তার সন্তানদের শিক্ষিত করা। বর্তমানে তার এক ছেলে একটি ব্যাংকে চাকরি করছেন, যা পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে এবং খামারের প্রসারে সহায়তা করেছে। চার বছর আগে জসিম উদ্দিন তার ছেলেদের সহায়তায় ০২ টি গরু নিয়ে আর হেরা এগ্রোটেক ফার্মের যাত্রা শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল খামারকে একটি আধুনিক ও মডেল খামারে রূপান্তরিত করা। বর্তমানে খামারে ছোট-বড় মিলে ৫০টি গরু রয়েছে। এসব গরুর মধ্যে দেশি, জার্সি এবং হলস্ট্রাইন ফ্রিজিয়ান জাতের গরু রয়েছে।

খামারের গরুগুলোর সুস্থতা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে তিনি অত্যন্ত যত্নশীল। খাদ্য হিসেবে গরুদের ভূষি, খৈল, চালের কুঁড়া, সয়াবিন, সবুজ ঘাস এবং খড় খাওয়ান। খামারের ৮ শতক জমিতে নিজেই সবুজ ঘাস চাষ করেন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য খামারে একটি কোয়ারান্টাইন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে নতুন গরু আনার আগে এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করা হয়। অসুস্থ গরুগুলোকে দ্রুত আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া, স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এবং পশু চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি গরুদের সুস্থ রাখেন। পরিচ্ছন্নতার জন্য প্রতি সপ্তাহে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে মেঝে পরিষ্কার করা হয় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পাইপলাইন সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে খামারটি সবসময় পরিচ্ছন্ন এবং স্বাস্থ্যকর থাকে।

বর্তমানে খামারের প্রতিটি গাভি থেকে দৈনিক ১৮ থেকে ২০ লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতিদিন মোট উৎপাদিত দুধের পরিমাণ ২০০ লিটার। দুধ স্থানীয় বেপারিদের কাছে এবং মিষ্টির দোকানে সরবরাহ করা হয়। গত কোরবানিতে খারাপ কোটি টাকার গরু বিক্রি করা হয়েছে। খামারটি পরিচালনা করতে ০৫ জন শ্রমিক কর্মরত আছেন এবং তারা মাসে ২০,০০০ টাকায় কাজ করছেন। তিনি আরো জানান প্রাণিসম্পদ অফিসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করেন এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে গরুর জন্য একটি আধুনিক সেড নির্মাণ করে দিয়েছেন।
মো. জসিম উদ্দিনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও দূরদর্শী। আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে তিনি খামারে ৫০টি ষাঁড় যোগ করার পরিকল্পনা করছেন, যেগুলো কোরবানির পশু হিসেবে বিক্রি করবেন। এবং গত কোরবানি ঈদে ১.৫ কোটি টাকার গরু বিক্রি করেন। এছাড়া, উৎপাদিত দুধ এবং মাংস ব্যবহার করে একটি রেস্টুরেন্ট খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি গোবর ব্যবহার করে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনেরও পরিকল্পনা করছেন, যা খামারের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে এবং অতিরিক্ত অংশ স্থানীয়দের সরবরাহ করা হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর থেকে তাকে প্রাণিসম্পদ বিষয়ক লিফলেট প্রদান করা হয়েছে
প্রতিবেদনকারী:খালেক হাসান,কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক,মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা
