তারিখ : ২৯.১০.২০২৫ খ্রি.
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি মাছের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। একসময় গ্রামীণ পরিবারের খাদ্য তালিকায় মাছ ছিল সহজলভ্য একটি উপাদান, কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলাশয় ভরাট ও প্রাকৃতিক মাছের পরিমাণ হ্রাসের ফলে দেশে মাছের ঘাটতি দেখা দেয়। তখনই আধুনিক পদ্ধতিতে পুকুর ও ঘেরে মাছ চাষ শুরু হয়, যা আজ বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় উৎপাদন খাতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে মৎস্য খাত। লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এই খাত গ্রামীণ অর্থনীতিকে করেছে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর। বিশেষ করে বেকার তরুণরা এখন মাছ চাষে যুক্ত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে, যার ফলে গ্রামাঞ্চলে অর্থনৈতিক গতি ও আত্মনির্ভরশীলতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতায় কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার অরণ্যপুর এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম গড়ে তুলেছেন তাঁর সফল মাছ চাষ প্রকল্প। ২০২০ সালে পারিবারিকভাবে তিনি ১২০ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেন। শুরুটা ছিল উৎসাহ আর আগ্রহের জায়গা থেকে, কিন্তু এখন সেটি তাঁর পরিবারের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি।
তিনি পুকুরে ক্যাটফিশ, বিগহেড ও সিলভার মাছ চাষ করেন। নিয়মিত ব্যবস্থাপনায় তিনি পুকুরের ইকো সিস্টেম সুস্থ রাখার জন্য এরিয়েটর প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, যা পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি রোধ করে এবং মাছের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। প্রতিদিন প্রায় ৭৫ কেজি “নারিশ” ব্র্যান্ডের ফিড মাছকে খাওয়ানো হয়। এবং তিনি নারিশ ফিড কোম্পানির একজন ডিলার।

নিয়মিত চুন, জিওলাইট, গ্যাস ট্যাবলেট, পটাশ ও লবণ ব্যবহার করে তিনি পুকুরের পানির গুণগত মান বজায় রাখেন। মাঝে মাঝে অক্সিজেন স্বল্পতা, ফুলকা পচা ও পেট ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিলেও তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেন এবং স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
ফার্মে একজন স্থায়ী শ্রমিক কাজ করেন এবং মাছ ধরার মৌসুমে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাছাড়া সাইফুল ইসলাম নিজেই পুকুর তদারকিতে সময় দেন। তাঁর পুকুরে প্রতি শতাংশে গড়ে ৬০ কেজি মাছ উৎপাদন হয়, এবং বছরে দুইবার মাছ বিক্রি করেন। পুকুরের পানির গভীরতা ছয় ফিট এবং প্রতি এক বছর পরপর পুকুর শুকিয়ে জীবাণুমুক্ত করেন। এবং পুকুরের পানি দূষিত হলে নিজস্ব মোটর স্থাপন করেছেন যাতে পানি সহজেই পরিবর্তন করা যায়।
তিনি নিয়মিত মৎস্য অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেছেন। তাঁর পরিবারে দুই ভাই ও পাঁচ বোন— সবাই কোনো না কোনোভাবে মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত। ফলে পুরো পরিবার এখন মাছ চাষে স্বাবলম্বী ও সফল।
সাইফুল ইসলামের ভাষায়, “মাছ চাষ শুধু লাভজনক নয়, এটা আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আমি চাই ভবিষ্যতেও এই খাতের সঙ্গেই থাকতে।”
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হয় তাঁর মতো চাষিদের মধ্যে, যা তাদের সচেতনতা ও উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ বেকারত্ব। দেশের হাজারো শিক্ষিত তরুণ চাকরির আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে। কিন্তু মো. সাইফুল ইসলামের মতো উদ্যোগী মানুষ প্রমাণ করেছেন, মাছ চাষের মতো খাতে সৎ পরিশ্রম ও পরিকল্পনা থাকলে নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব। মাছ চাষ আজ শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের নয়, বেকার সমস্যা নিরসনেরও একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনকারী:
খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা।
