একসময় সংসারের অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। স্বামীর অসুস্থতার পর পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হতো মনোয়ারা খাতুনকে। সেই পরিস্থিতি বদলাতে নিজেই শুরু করেন মাছ চাষ। পরিশ্রম, আগ্রহ আর সঠিক পরামর্শে ধীরে ধীরে ঘুরে যায় তার ভাগ্যের চাকা।
এখন মাছ চাষের পাশাপাশি ছাগল পালন ও বস্তায় আদা চাষেও যুক্ত হয়েছেন তিনি। নিজের উদ্যোগে আয় করে সংসারে অবদান রাখার পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রার এই নারী।মনোয়ারা খাতুন খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের কাটমারচর গ্রামের বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে স্বামীর শারীরিক অসুস্থতার পর স্বল্প পরিসরে মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। শুরুতে অভিজ্ঞতার ঘাটতি ও নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও ইআরসিসি-২ প্রকল্পের পরামর্শ ও সহযোগিতায় ধীরে ধীরে মাছ চাষের বিভিন্ন কৌশল আয়ত্ত করেন।বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশ জমিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করছেন মনোয়ারা। পাশাপাশি দুটি ছাগল দিয়ে পালন শুরু করে এখন তার খামারে ছাগলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আটটিতে।
মনোয়ারা বলেন, ‘শুরুতে মাছ চাষ সম্পর্কে আমার তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না। ইআরসিসি-২ প্রকল্পের পরামর্শ ও সহযোগিতায় ধীরে ধীরে মাছ চাষের বিভিন্ন কৌশল শিখেছি। মাছের খাবার দেওয়া, পুকুরের পানি ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণসহ নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছি। এখন মাছ বিক্রি করে নিয়মিত আয় করতে পারছি।’তিনি আরও বলেন, মাছ চাষ ও ছাগল পালনের আয় দিয়ে সংসারে সহযোগিতা করতে পারছেন। নিজের কাজের মাধ্যমে আলাদা একটি পরিচয়ও তৈরি হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের কাটমারচর গ্রামে জেজেএস ইআরসিসি-২ প্রকল্পের আওতায় মনোয়ারার মাছ চাষসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক কার্যক্রমের প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তীলক কুমার ঘোষ, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সমীর কুমার সরকার, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা কে এম মফিজুর রহমান, বিআরডিবির এআরডিও আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ সংশ্লিষ্টরা।এ সময় জেজেএস ইআরসিসি-২ প্রকল্পের উপজেলা সমন্বয়কারী নাসির উদ্দীন, ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর শরিফুর রহমান, মোছা. নুসরাত জাহান ও এলএসপি রাবেয়া খাতুন উপস্থিত ছিলেন।
শুধু মনোয়ারা নন, ইআরসিসি-২ প্রকল্পের আওতায় উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের প্রায় ৭০০ উপকারভোগী বিভিন্ন আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বড়বাড়ী গ্রামের প্রভা রাণী মণ্ডল, রাবেয়া খাতুনসহ অনেকে ধান-মাছ সমন্বিত চাষ, ছাগল পালন ও বস্তায় আদা চাষের মতো উদ্যোগ নিয়েছেন।উপকারভোগীরা জানান, আগে সংসার চালাতে তাদের অনেক কষ্ট হতো। নিজের কিছু করার ইচ্ছা থেকেই অল্প জমিতে মাছ চাষসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক কাজ শুরু করেন তারা। শুরুতে ভয় ও অনিশ্চয়তা থাকলেও পরিশ্রম এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেয়ে এখন এসব কর্মকাণ্ড থেকে আয় করতে পারছেন।স্থানীয়দের মতে, উপকূলীয় কয়রায় ঘরের কাজের পাশাপাশি নারীরা কৃষি, মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালনের মতো কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এতে পরিবারের আয় বাড়ার পাশাপাশি নারীদের আত্মনির্ভরশীলতাও তৈরি হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তীলক কুমার ঘোষ বলেন, নারীদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা গেলে পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি তাদের আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি পায়। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় পরামর্শের মাধ্যমে এসব উদ্যোগ আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সমীর কুমার সরকার বলেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পরিচর্যা করলে অল্প জায়গা থেকেও মাছ চাষে ভালো উৎপাদন পাওয়া সম্ভব। নারীদের মাছ চাষে উৎসাহিত করতে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: ভোরের ডাক
