কুমিল্লা জেলার লালমাই উপজেলার শিকারিপাড়া গ্রামের একজন পরিশ্রমী ও দূরদর্শী মানুষ মো. হানিফ মিয়া। তিনি শুধু একজন গবাদিপশুর খাদ্য বিক্রেতা নন, বরং একজন সফল খামারি হিসেবে এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন। ২০১৮ সালে মাত্র ৩টি গরু নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও আজ তার খামারে রয়েছে ২৮টি গরু, এবং তার সাফল্যের গল্প আজ অনেক যুবকের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মো. হানিফ মিয়া শুরুতেই বুঝেছিলেন যে, সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত পরিচর্যা ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে পারলে গরু পালন শুধু একটি পারিবারিক কাজ নয়, বরং একটি লাভজনক ব্যবসায় রূপ নিতে পারে। গরুর খাদ্য বিক্রির সাথে যুক্ত থাকার কারণে তিনি খুব সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন কোন গরুর জন্য কোন খাদ্য কতটা প্রয়োজন এবং কীভাবে খরচ কমিয়ে লাভ বাড়ানো যায়।
প্রথম বছর তিনি ৩টি গরু দিয়ে খামার শুরু করেন। যত্ন আর পরিকল্পনার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই গরুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০টিতে। এরপর তিনি আরও ২টি গরু ক্রয় করেন। বর্তমানে তার খামারে ২৮টি গরু রয়েছে। এই সংখ্যা শুধু গরুর পরিমাণ নয়, এটি তার শ্রম, মেধা ও ধৈর্যের বাস্তব প্রতিফলন।
তার খামার থেকে প্রতিদিন ১১৪ লিটার দুধ পাওয়া যায়, যা তিনি স্থানীয় বাজারে প্রতি লিটার ৮০ টাকা দরে বিক্রি করেন। এতে প্রতিদিন তার আয় হয় প্রায় ৯,১২০ টাকা, যা মাসিক হিসাবে প্রায় ২,৭৩,৬০০ টাকা। শুধু দুধ বিক্রিই নয়, সময়মতো গরু বিক্রি করেও তিনি আলাদা আয় করেন।
হানিফ মিয়া তার গরুগুলোর জন্য একটি সুসম খাদ্য তালিকা অনুসরণ করেন যাতে রয়েছে সবুজ ঘাস, খড়, ভুষি, কুঁড়া, খৈল এবং দানাদার ফিড। এই বৈচিত্র্যময় খাদ্য তালিকা গরুর দুধের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করেছে।
গরুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাতেও তিনি অত্যন্ত সচেতন। তিনি নিয়মিত খামারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখেন এবং গরুদের সঠিক টিকা ও ওষুধ প্রয়োগ করেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের ফলে তিনি সময়মতো পরামর্শ ও সহায়তা পান। ফলে খামারে রোগবালাই প্রায় হয়ই না, যা তার লাভবান হওয়ার অন্যতম কারণ।
মো. হানিফ মিয়ার চোখ শুধু বর্তমানেই আটকে নেই। ভবিষ্যতে তিনি তার খামার আরও বড় করতে চান। তিনি পরিকল্পনা করছেন একটি দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট স্থাপন করার, যেখানে খামার থেকে সংগৃহীত দুধ দিয়ে দধি, ঘি, মিষ্টি ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করা হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, কাঁচা দুধ বিক্রির চেয়ে এসব পণ্য বিক্রি করে অনেক বেশি লাভ করা সম্ভব।
তিনি ইতোমধ্যে কিছু মৌলিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন দধি ও মিষ্টি তৈরির বিষয়ে এবং স্থানীয় বাজারে এর চাহিদাও যাচাই করেছেন। তার ইচ্ছা, একদিন তার নিজস্ব ব্র্যান্ড থাকবে-যা শুধু কুমিল্লা নয়, সারা বাংলাদেশে পরিচিত হবে।
তার সফলতা শুধু নিজের জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। তার খামারে বর্তমানে ১ জন কর্মচারী কাজ করেন, যারা এখান থেকে একটি নির্ভরযোগ্য জীবিকা নির্বাহ করছেন। এছাড়া তিনি অন্য খামারিদের সহায়তা করেন, তাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শ দেন।
মো. হানিফ মিয়ার এই সফলতার পেছনে রয়েছে পরিশ্রম, ধৈর্য, সঠিক পরিকল্পনা এবং আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার। তার এই খামার শুধু একটি দুধ উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি উদাহরণ-যেখানে প্রমাণ হয়, ইচ্ছা থাকলে অল্প থেকে শুরু করেও বড় কিছু গড়া সম্ভব।
যেখানে অনেক তরুণ বেকারত্বে হতাশ, সেখানে মো. হানিফ মিয়া তার খামারের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, দেশে থেকেই একটি স্বাবলম্বী জীবন গঠন করা সম্ভব। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ইতিবাচক মানসিকতা আমাদের সকলের জন্য অনুপ্রেরণা। সঠিক দিকনির্দেশনা, সহযোগিতা ও নিজের চেষ্টায় বাংলাদেশের খামারিরাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করতে পারে-এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
এভাবেই গরু পালনকে কেন্দ্র করে মো. হানিফ মিয়া হয়ে উঠেছেন একজন প্রকৃত উদ্যোক্তা। তাঁর গল্পটি নিঃসন্দেহে দেশের হাজারো তরুণের মাঝে নতুন সম্ভাবনার আলো জ্বালাবে।
সবশেষে,মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের মুদ্রণ সামগ্রী প্রদান করা হয় এসাথে দপ্তরের বিভিন্ন কাজ ও পরিচিতি দেয়া হয়।
প্রতিবেদনকারী:
সুরাইয়া আক্তার
কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য প্রাণীসম্পদ তথ্য দপ্তর
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা
