কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার দিশাবন গ্রামের বাসিন্দা মো. আবদুল মতিন । তিনি গ্রামের সবার কাছে মতিন কাকা নামেই পরিচিত। বয়স এখন ৭৫ হলেও তার মধ্যে কাজের প্রতি যে নিষ্ঠা, তা অনেক তরুণেরও নেই। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি পারিবারিকভাবে গরু পালন করে আসছেন। তার ছোট্ট খামারে রয়েছে সাতটি গরু– সেগুলো তিনি নিজের সন্তানের মতো যত্ন করেন।
প্রতিদিন ভোরেই তার দিন শুরু হয়। নামাজ শেষ করে প্রথমেই তিনি যান খামারে। দূর থেকে তার কণ্ঠ শুনে গরুগুলো ডাকতে শুরু করে–যেন অনেক দিনের আপনজনকে স্বাগত জানায়। খামারটি খুব বড় না হলেও পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল। বাঁশের বেড়ায় ঘেরা ছাউনি দেওয়া সেই খামারে প্রতিটি গরুর আলাদা জায়গা রয়েছে। মতিন কাকার নিয়মিত যত্নের কারণেই গরুগুলো সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। গরুর খাবারের জন্য তিনি কখনো বাড়তি খরচ করেন না। বহু বছর ধরে তিনি জানেন কোন খাবার কোন গরুর জন্য ভালো। তার নিজের জমিতে চাষ করা সবুজ ঘাস গরুগুলোর প্রধান খাদ্য। এছাড়া খড়, ভাতের মাড়, কুঁড়া-ভুষি–এসব ঘরোয়া খাবার দিয়েই তিনি প্রতিদিন গরুকে খাওয়ান। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রাকৃতিক খাবারই গরুকে সুস্থ রাখে এবং দুধের মান ভালো করে। গ্রামের মানুষও তার গরুর দুধের মান নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট। অনেকে তো বলেন, মতিন কাকার দুধের মতো স্বাদ আর কোথাও পাওয়া যায় না।
সকাল, দুপুর, বিকেল–দিনের প্রতিটি সময়ই তার একটি নির্দিষ্ট রুটিন আছে। সকালে খাবার দিয়ে গরুগুলোকে গোসল করানো, দুপুরে কিছুক্ষণ মুক্তভাবে মাঠে চরে বেড়াতে দেওয়া, বিকেলে আবার ঘাস-কুঁড়া মিশিয়ে খাবার দেওয়া– সব মিলিয়ে তার যত্ন যেন নিখুঁত। বয়স হয়েছে বটে, কিন্তু গরুগুলোর জন্য তার ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ তাকে সবসময় শক্তি জোগায়।
গরু অসুস্থ হলে তিনি কখনো দেরি করেন না। গ্রামের স্থানীয় প্রাণিচিকিৎসককে দ্রুত খবর দেন। চিকিৎসকও তাকে খুব সম্মান করেন, কারণ মতিন কাকা সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলেন। অসুস্থ গরুকে আলাদা করে রাখেন, খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং সময়মতো ওষুধ খাওয়ান। রাতেও কয়েকবার খামারে গিয়ে দেখেন গরুর অবস্থা কেমন। তার যত্নে অধিকাংশ সময় গরুগুলো দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
তরুণরা প্রায়ই তার কাছে আসে গরু পালনের পরামর্শ নিতে। তিনি হাসিমুখে সবাইকে শেখান–কীভাবে খামার পরিষ্কার রাখতে হয়, কোন খাবার গরুর জন্য উপযুক্ত, কীভাবে রোগ প্রতিরোধ করা যায়। তিনি বলেন, “গরু পালন শুধু কাজ নয়, এটা একটা ভালোবাসা। মন দিয়ে যত্ন করলে গরুও আপন হয়ে যায়।”
দিনশেষে তিনি খামারের সামনে বসে সূর্যাস্ত দেখেন। পিছনে গরুগুলোর ডাক, সামনে মাঠের শান্ত দৃ্শ্য– এইভাবেই কেটে যায় তার দিন। তার কাছে জীবনের সেরা সুখ হলো নিজের পরিশ্রমের ফল দেখে বাঁচা, নিজের হাতে গড়ে ওঠা খামারের সাথে এক গভীর সম্পর্কে বাঁধা থাকা
মো. আবদুল মতিন শুধু একজন গরু পালনকারী কৃষক নন; তিনি গ্রামের এক অনুপ্রেরণা, এক শ্রমনিষ্ঠ মানুষের প্রতিচ্ছবি, যার জীবন তার কাজের মধ্যেই জ্বলজ্বল করে।
।সবশেষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের পরিচিতি দেয়া হয় এবং তথ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত প্রাণিসম্পদ বিষয়ক মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
প্রতিবেদনকারী:
সুরাইয়া আক্তার, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা।
