মো. আবদুল গফুর কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার কাজিপাড়া গ্রামের একজন পরিচিত ও সম্মানিত মানুষ। ছোট্ট এই গ্রামেই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, জীবনসংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প। গ্রামের মাটির সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু আবেগের নয়, বরং জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বর্তমানে তার বয়স ৭৫ বছর হলেও আজও তিনি কর্মঠ, দৃঢ়চেতা এবং পরিশ্রমী একজন মানুষ হিসেবে সবার কাছে অনুপ্রেরণা।
যৌবনকালে মো. আবদুল গফুর জীবিকার সন্ধানে নানা কাজ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি দুধ ব্যবসাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। এলাকার বিভিন্ন বাড়ি ও খামার থেকে তিনি প্রতিদিন ভোরবেলা দুধ সংগ্রহ করতেন। কাঁধে দুধের ক্যান নিয়ে কিংবা সাইকেলে চড়ে শহরের দিকে রওনা হতেন। শহরের দই ও মিষ্টি ব্যবসায়ীরা তার কাছ থেকে পাইকারি দামে দুধ কিনতেন। সততা ও নিয়মিত সরবরাহের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন বিশ্বাসযোগ্য দুধ সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিতি পান।
দুধ ব্যবসার পাশাপাশি তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে তার বাবার কাছ থেকে পাওয়া দুটি গরুর দেখাশোনা শুরু করেন। এই দুটি গরুই ছিল তার খামার জীবনের মূল ভিত্তি। গরু দুটির দুধ বিক্রি এবং ক্ষেতের কাজ থেকে পাওয়া আয় দিয়েই তার সংসার চলত। জমিতে ধান, সবজি ও পশুখাদ্যের জন্য ঘাস চাষ করতেন। কৃষিকাজ ও পশুপালন-এই দুইয়ের সমন্বয়েই তার জীবন ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার অভিজ্ঞতাও বাড়তে থাকে। তিনি বুঝতে পারেন, সঠিক পরিচর্যা আর পরিশ্রম করলে পশুপালনই হতে পারে তার জীবনের মূল শক্তি। বয়স বাড়লেও তার খামারের পরিধি কমেনি, বরং বেড়েছে। আজ তার খামারে রয়েছে ১০টি গরু ও ৮টি ছাগল। প্রতিটি পশুর প্রতি তার আলাদা মমতা ও যত্ন আছে। তিনি বলেন, “পশু কথা বলতে পারে না, কিন্তু ঠিকমতো যত্ন নিলে তারা ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়।”
খামারের সব কাজই মূলত পরিবারের সদস্যরাই মিলেমিশে করে থাকেন। ছেলে, পুত্রবধূ আর নাতি-নাতনিরা সবাই নিজেদের মতো করে দায়িত্ব পালন করে। কেউ ঘাস কেটে আনে, কেউ খাবার প্রস্তুত করে, কেউবা গরু-ছাগলের পরিচর্যা করে। গরু ও ছাগলকে নিয়মিত ঘাস, খড়, খৈল, ভুষি ও সয়াবিন খাওয়ানো হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার বিশ্বাস, পরিষ্কার পরিবেশ থাকলে পশু কম অসুস্থ হয়।
তবুও কখনো কখনো গরু বা ছাগল অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দেরি না করে স্থানীয় প্রাণী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। সময়মতো চিকিৎসা করানোর ফলে বড় কোনো ক্ষতির মুখে পড়তে হয়নি তাকে। গ্রামের অনেকেই এখন তার পরামর্শ নেয়-কীভাবে পশু পালন করতে হয়, কী খাবার দিলে দুধ বাড়ে কিংবা অসুখ হলে কী করতে হয়।
মো. আবদুল গফুরের জীবন একদিকে যেমন সংগ্রামের, অন্যদিকে তেমনি সাফল্যেরও। সীমিত সম্পদ নিয়েও কীভাবে ধৈর্য, সততা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়া যায়, তার জীবন তারই প্রমাণ। বয়সের ভার তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। আজও তিনি ভোরে উঠে খামারের দিকে তাকিয়ে থাকেন, পশুগুলোর অবস্থা দেখেন, আর মনে মনে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করেন।
গ্রামের মানুষ তাকে শুধু একজন দুধ ব্যবসায়ী বা খামারি হিসেবেই নয়, একজন অভিজ্ঞ অভিভাবক ও পরামর্শদাতা হিসেবেও সম্মান করে। মো. আবদুল গফুরের গল্প আসলে গ্রামীণ বাংলাদেশের হাজারো পরিশ্রমী মানুষের প্রতিচ্ছবি-যারা নীরবে কাজ করে যান, পরিবার গড়েন, সমাজকে এগিয়ে নেন, আর নিজের জীবন দিয়ে অন্যদের জন্য রেখে যান অনুপ্রেরণার আলো।
সবশেষে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের পরিচিতি দেয়া হয় এবং তথ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত প্রাণিসম্পদ বিষয়ক মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
প্রতিবেদনকারী:
সুরাইয়া আক্তার, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, কুমিল্লা।
