চাকরির পেছনে না ছুটে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে গবাদিপশু পালন করলে একদিকে যেমন বেকারত্ব দূর হয়, অন্যদিকে সৃষ্টি হয় আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ এমন ধারণা নিয়ে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার নাগাইশে গড়ে উঠেছে একটি আধুনিক পশুখামার। প্রবাসে থেকেও নিজ জন্মভূমিতে খামার গড়ে তুলে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রবাসী রাজা মিয়া। বর্তমানে তার এ খামার দেখাশোনা করছেন তার ছেলে রাব্বি মিয়া এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন মো. জামাল হোসেন।
খামারটি অত্যন্ত সুন্দর, গোছানো ও পরিপাটি। প্রায় ১০ বছর আগে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হলেও গত বছর থেকে খামারটি বাণিজ্যিকভাবে পশুর মোটাতাজাকরণের কাজ শুরু করে।

বর্তমানে খামারটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১০৬টি গবাদিপশু রয়েছে। খামার ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে আধুনিক নিয়মে তৈরি করা হয়েছে তিনটি শেড, যার মধ্যে একটি বড় এবং দুটি ছোট শেড। খামারে সংরক্ষিত পশুর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জাতের হলেস্টেইন ফ্রিজিয়ান, শাহীওয়াল, গির এবং কিছু দেশি জাতের গরু। প্রধানত কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এবং চার থেকে পাঁচ মাস পর পর বড় আকারের মোটাতাজাকৃত গরু বিক্রির উদ্দেশ্যে খামারটি পরিচালিত হচ্ছে।
খামার মালিক রাজা মিয়ার ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল নিজ এলাকায় এমন একটি প্রতিষ্ঠান করা, যা স্থানীয় বেকারদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। শুধু গবাদিপশুই নয়, এই প্রজেক্টের অধীনে আরও রয়েছে একটি মুরগির খামার, মাছের খামার এবং একটি ছাগলের খামার। এসব প্রজেক্টে বর্তমানে মোট ৯ জন কর্মচারী নিয়মিত কাজ করছেন। কর্মচারীদের থাকা-খাওয়ার সুবিধা ছাড়াও মাসে ২০ হাজার টাকা করে বেতন প্রদান করা হয়।

খামারে গরু দ্রুত ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মোটাতাজাকরণের জন্য পুষ্টিকর খাবারের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়। বাজারভিত্তিক রেডিমেইড ফিডের পাশাপাশি নিজস্ব ফর্মুলায় তৈরি খাবার দেওয়া হয় গবাদিপশুকে। খামার প্রতিনিধি জামাল হোসেন জানান, ভুষি, ভুট্টা, সয়াবিন ও কুঁড়া সঠিক অনুপাতে মিশ্রণ করে তারা নিয়মিত দানাদার খাদ্য তৈরি করেন। এছাড়া পশুর জন্য নিজস্ব জমিতে উৎপাদিত তাজা সবুজ ঘাসের যোগান রয়েছে।
গবাদিপশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত টিকা দেয়া হয়। সম্প্রতি খামারে খুরা রোগ (এফএমডি)-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। স্থানীয় চিকিৎসকদের পাশাপাশি উপজেলা ও জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়। জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস কুমিল্লার ট্রেনিং অফিসার ডাক্তার মো. ইসমাইল হোসেনের পরামর্শ ও সহযোগিতা খামার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শিক্ষিত বেকার তরুণদের উদ্দেশ্যে খামার কর্তৃপক্ষের পরামর্শ চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে খামার শুরুর আগে সঠিক পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। নতুন কোনো উদ্যোক্তা পরামর্শ বা সহযোগিতার জন্য এলে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।
খামার পরিদর্শন শেষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তরের সৌজন্যে প্রকাশিত সচেতনতামূলক বিভিন্ন মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। বিশেষ করে ‘গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ’ এবং ‘গবাদিপশু পালন ও রোগ প্রতিরোধ’ সম্পর্কিত এসব নতুন গাইডলাইন ও প্রচার সামগ্রী খামার কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যা খামার পরিচালনায় খামারি ও কর্মচারীদের বিশেষ সহায়াতা করবে।
অবশ্য বর্তমানে গরুর খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বেশি থাকায় এ খাতকে আরও সমৃদ্ধ করতে সরকারের সর্বোচ্চ সহযোগিতা ও বাজার মনিটরিংয়ের জোর দাবি জানান খামার সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদক : খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা।
