দীর্ঘ ১৪ বছরের প্রবাস জীবনের ক্লান্তি আর একঘেয়েমি কাটিয়ে দেশে ফিরেছিলেন মোহাম্মদ আবুল হোসেন। স্বজনদের কাছে থেকে দেশে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছা থেকেই শুরু করেন পোল্ট্রি ব্যবসা। সেই সিদ্ধান্তই আজ তাঁকে এনে দিয়েছে আর্থিক স্বচ্ছলতা ও একজন সফল খামারি হিসেবে প্রতিষ্ঠা। বর্তমানে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার কমলাপুরে তিনি পরিচালনা করছেন একটি আধুনিক লেয়ার মুরগির খামার, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে আরও ৭ জন মানুষের।

আবুল হোসেন দীর্ঘদিন দুবাইতে কর্মরত ছিলেন। দেশে ফিরে নতুন কিছু করার পরিকল্পনা করলে তাঁর বন্ধু, যিনি আগেই পোল্ট্রি শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন – তাঁকে খামার করার পরামর্শ দেন। বন্ধুর দিকনির্দেশনায় মাত্র ১,০০০টি ব্রয়লার মুরগি নিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে ব্রয়লার মুরগির সংখ্যা বাড়ালেও বারবার রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েন।
পরবর্তীতে বন্ধুর সহযোগিতায় চৌয়ারার বাজারে লেয়ার মুরগি পালনের নতুন পরিকল্পনা করেন। মাত্র ৩,০০০টি লেয়ার মুরগি দিয়ে লেয়ার খামারের গোড়াপত্তন হয়। দেখতে দেখতে সফলতার ৬ বছর পার করেছেন তিনি। বর্তমানে তাঁর খামারে লেয়ার মুরগির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫,০০০টিতে।
দৈনিক ডিম উৎপাদন ও আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া
আবুল হোসেনের খামারে বর্তমানে ৪টি শেড রয়েছে এবং আরও একটি অত্যাধুনিক শেড নির্মাণের কাজ চলছে।
খামারটি ঘুরে দেখা যায়, সেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি – যার মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ফ্যান, সিসি ক্যামেরা এবং গরম নিয়ন্ত্রণের জন্য ঝর্ণা (স্প্রিংকলার) সিস্টেম। তিনি নিজেই প্রতিদিন খামারের সার্বিক তদারকি করেন। বর্তমানে তাঁর ৫,০০০টি লেয়ার মুরগি থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪,২০০ থেকে ৪,৫০০টি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হয়। খামারে কর্মরত ৭ জন শ্রমিকের প্রতিজনের মাসিক বেতন ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। ফলে তাঁর এই উদ্যোগ কেবল নিজের ভাগ্যই বদলায়নি, ৭টি পরিবারের জীবিকার সংস্থানও করেছে।

পোল্ট্রি ব্যবসায় নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। অতীতে আবুল হোসেনের খামারে গামবোরো ও রানীক্ষেতের মতো মারাত্মক রোগের আক্রমণ হলেও সঠিক সময়ে টিকা (ভ্যাকসিন) প্রদান ও নিবিড় পরিচর্যা করায় তিনি বড় ধরনের ক্ষতি থেকে বেঁচে যান। তবে প্রাণিসম্পদ অফিসের সাথে যোগাযোগ নেই বলে জানান।
এছাড়া বর্তমানে পোল্ট্রি শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট হলো পোল্ট্রি ফিড বা খাদ্যের ঊর্ধ্বগতি। খাদ্য ও ওষুধের অতিরিক্ত দামের কারণে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে পোল্ট্রি শিল্প একটি অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক খাত। আবুল হোসেন বিশ্বাস করেন, প্রবাসীরা যদি সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে দেশে ফিরে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চান, তবে পোল্ট্রি শিল্পে বিশাল সুযোগ রয়েছে। বেকার যুবকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,
”সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে পোল্ট্রি খাতে সফল হওয়া সম্ভব। তবে সরকারের পক্ষ থেকে পোল্ট্রি ফিডের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সহজ শর্তে প্রবাসীদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা হলে বহু প্রবাসী দেশে ফিরে বেকারত্ব দূর করতে ভূমিকা রাখতে পারবেন।”
দেশীয় খামারিদের সুরক্ষায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিসের সঠিক তদারকি ও সহায়তা পেলে পোল্ট্রি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে বলে মনে করেন এই সফল উদ্যোক্তা। সবশেষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর কর্তৃক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রকাশিত মুদ্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে দেয়া হয়।
প্রতিবেদক, খালেক হাসান, কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক
আঞ্চলিক অফিস, কুমিল্লা।
